বক্স অফিসে মুখ থুবড়ে পড়েছে টম ক্রুজ অভিনীত ‘ডিগার’। সমালোচকদেরও একাংশের চোখে ছবিটি আড়ম্বরপূর্ণ, অতিরঞ্জিত এবং অগভীর। অথচ জলবায়ু সংকটের দায় এড়িয়ে চলা আধুনিক সমাজের মুখোমুখি দাঁড় করানোর ক্ষেত্রে এই ছবিই হয়ে উঠেছে আমাদের সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চলচ্চিত্র।

ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্র ডিগার রকওয়েল এক টেক্সাসি তেল ব্যবসায়ী। তার তেল উত্তোলনের জেরে মেরু অঞ্চলের বরফের চাদরে বিপর্যয়কর ভাঙন দেখা দেয়। বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় ওয়াশিংটন ডিসির আয়তনের পাঁচ গুণ এক বিশাল হিমশৈল, যা ইউরোপের দিকে ধেয়ে গিয়ে ভয়াবহ সুনামির আশঙ্কা তৈরি করে। কিন্তু পরিবেশের এই বিপর্যয় নিয়ে ডিগারের বিন্দুমাত্র মাথাব্যথা নেই। মুনাফার নেশায় সে এতটাই মত্ত যে নিজের কর্মকাণ্ডের ভয়াবহ পরিণতিও তাকে বিচলিত করে না।

আলেহান্দ্রো গনসালেস ইনারিতুর পরিচালনায় ছবিটি জলবায়ু সংকটের মুখে ক্ষমতাবানদের উদাসীনতা, সুবিধাবাদ এবং নৈতিক কাপুরুষতাকে ব্যঙ্গ করেছে। তবে ছবির বক্তব্য যতই গুরুত্বপূর্ণ হোক, দর্শকের মন জয় করতে পারেনি ‘ডিগার’। বক্স অফিসে ছবিটির সম্ভাব্য লোকসান প্রায় ২৪ কোটি ৫০ লক্ষ ডলার বলে অনুমান করা হচ্ছে। আমেরিকায় মুক্তির প্রথম সপ্তাহান্তে আয় হয়েছিল মাত্র ৮০ লক্ষ ডলার। দ্বিতীয় সপ্তাহান্তে সেই আয় কমে যায় ৬০ শতাংশ। তৃতীয় সপ্তাহ শুরু হওয়ার আগেই আড়াই হাজারের বেশি মার্কিন প্রেক্ষাগৃহ থেকে সরিয়ে নেওয়া হয় ছবিটি। এমনকি নিউ ইয়র্কের ম্যানহাটনের একটি বড় প্রেক্ষাগৃহে বৃহস্পতিবার দুপুরে ছবিটি দেখতে গিয়ে লেখক দেখেছেন, তাঁর সঙ্গে দর্শক ছিলেন মাত্র দু’জন।

এই ব্যর্থতার পিছনে ছবির নির্মাণশৈলী ও অভিনয়ের ধরনও কিছুটা দায়ী। টম ক্রুজের অনুরাগীরা তাঁকে সাধারণত নিখাদ নায়কের ভূমিকায় দেখতে অভ্যস্ত। সেখানে ‘ডিগার’-এ তাঁকে দেখা যায় বয়স্ক, টাকপড়া এক তেল ব্যবসায়ীর চরিত্রে—মাথায় স্টেটসন টুপি, পায়ে কাউবয় বুট, আর মুখে কৃত্রিম টেক্সাসি টান। জলবায়ু বিপর্যয় নিয়ে অন্ধকার ব্যঙ্গের এই জগৎ ক্রুজের পরিচিত পর্দার ছবির থেকে একেবারেই আলাদা।

সমালোচকদের অভিযোগ, ক্ষমতাবানদের নৈতিক দেউলিয়াপনা তুলে ধরতে গিয়ে ছবিটি কখনও কখনও অতিরঞ্জনের সীমা ছাড়িয়েছে। নিজের প্রধান বিজ্ঞানী নীরব গণেশের সামনেই ডিগার যখন বিপন্ন প্রজাতির টুনা মাছ খেতে থাকে, তখন বক্তব্যটি যেন জোর করে দর্শকের সামনে ঠেলে দেওয়া হয়। গণেশের চরিত্রে রয়েছেন রিজ আহমেদ। একই ভাবে, আসন্ন বিপর্যয়ের মুখেও মার্কিন প্রেসিডেন্টের উদাসীনতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। জন গুডম্যান অভিনীত প্রেসিডেন্টের মুখে শোনা যায়, ‘জানো কী, এটা আমার সমস্যা নয়।’ পিট হেগসেথের আদলে তৈরি এক যুদ্ধবাজ জেনারেল আবার হিমশৈলটিকে বরফের শরবতের সঙ্গে তুলনা করে পরমাণু অস্ত্র দিয়ে সেটিকে উড়িয়ে দেওয়ার পরামর্শ দেয়।

কিন্তু এই স্থূল ব্যঙ্গের আড়ালেই লুকিয়ে রয়েছে ছবিটির সবচেয়ে অস্বস্তিকর সত্য। এক দৃশ্যে ডিগার ও গণেশ আগুনের শিখার দিকে তাকিয়ে থাকে, যেন তারা নরকের মধ্যে বসে রয়েছে। দৃশ্যটি যেন মনে করিয়ে দেয়, জলবায়ু বিপর্যয় কোনও দূরবর্তী ভবিষ্যতের ভয় নয়। হয়তো আমরা ইতিমধ্যেই সেই নরকের দিকে এগিয়ে চলেছি। আর তার জন্য শুধু মুনাফালোভী তেল ব্যবসায়ীরাই দায়ী নয়।

বিশ্ব উষ্ণায়নের ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে ডিগার জানত। বাস্তবেও তেল সংস্থাগুলি কয়েক দশক ধরে জলবায়ু পরিবর্তনের বিপদ সম্পর্কে অবগত ছিল। তবু মুনাফার স্বার্থে সেই সত্যকে আড়াল করা হয়েছে, যার পরিণতি হতে পারে প্রাণঘাতী। গণেশ যখন ডিগারকে ‘সর্বকালের সবচেয়ে জঘন্য অপরাধ’-এর জন্য ধিক্কার জানায়, তখন দর্শকের দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্ষোভ যেন কিছুটা মুক্তি পায়।

তবে ‘ডিগার’ কেবল একজন খলনায়কের মুখোশ খুলে দেয় না। ২০২১ সালের ছবি ‘ডোন্ট লুক আপ’-এ পৃথিবীর দিকে ধেয়ে আসা একটি গ্রহাণুর বিপদ সম্পর্কে বিজ্ঞানীরা সতর্ক করলেও সমাজের বড় অংশ সেই বার্তা উপেক্ষা করে। ‘ডিগার’-এর বক্তব্য আরও গভীর এবং অস্বস্তিকর: জলবায়ু সংকটের ভয়াবহতা আমরা জানি, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য কী বিপর্যয় রেখে যাচ্ছি, তা-ও জানি। তবু যেন সব কিছু মেনে নিয়ে দিব্যি জীবন কাটিয়ে চলেছি।

ইউরোপীয় আইনপ্রণেতাদের সামনে এক দীর্ঘ বক্তৃতায় ডিগার বলে, ‘বাজে কথা বন্ধ করা যাক। আপনারা তেল ভালোবাসেন। পরিবেশের পক্ষে টেকসই নয়, এমন জীবনযাপনেই আপনারা আয়েশ করতে চান।’ কথাগুলি নির্মম, কিন্তু একেবারে ভিত্তিহীন নয়। তেল সংস্থাগুলি মিথ্যা বলে থাকতে পারে, রাজনীতিকদের প্রভাবিত করে থাকতে পারে। কিন্তু তাদের জবাবদিহির আওতায় আনতে ব্যর্থ হয়ে আমরাও কি সেই ব্যবস্থার অংশ হয়ে উঠিনি?

জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার আমাদের শ্বাসরোধ করছে, তাপপ্রবাহে বিপন্ন করছে, বন্যায় ডুবিয়ে দিচ্ছে। তবু আমরা তার ক্রেতা হয়েই রয়েছি। কারণ, দৈনন্দিন জীবনযাপনে সামান্য পরিবর্তন আনতেও আমাদের অনীহা। মাংস একটু কম খাওয়া, বিমানে কম যাতায়াত করা কিংবা এমন গাড়ি ব্যবহার করা, যার জ্বালানি সহজে সব পেট্রল পাম্পে পাওয়া যায় না—এসবই যেন অসহনীয় অসুবিধা। ডিগার ইউরোপীয় আমলাদের মনে করিয়ে দেয়, ফোনে চার্জ দেওয়া আর টিকটক দেখার মতো কাজও তো আমাদের রয়েছে!

এইখানেই ‘ডিগার’ আমাদের সামনে এক অস্বস্তিকর আয়না তুলে ধরে। জলবায়ু সংকটের দায় শুধু রাষ্ট্রপ্রধান, তেল ব্যবসায়ী কিংবা শিল্পপতিদের নয়; আমাদের ভোগবাদী জীবনযাপনও সেই সংকটকে দীর্ঘায়িত করছে। আমরা পরিবর্তন চাই, কিন্তু নিজের সুবিধা ছাড়তে চাই না। বিপর্যয় ঠেকানোর কথা বলি, অথচ সেই বিপর্যয়ের কারণ হয়ে ওঠা অভ্যাসগুলি আঁকড়ে ধরে থাকি।

বাসযোগ্য পৃথিবীর সম্ভাব্য অবসান নিয়ে জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে যে তুলনায় কম কাজ হয়েছে, তা-ও বিস্ময়কর। ‘ওয়াটারওয়ার্ল্ড’-এ মেরু অঞ্চলের বরফ গলে প্লাবিত পৃথিবীতে বেঁচে থাকার লড়াই দেখানো হয়েছিল। ‘দ্য ডে আফটার টুমরো’-তে বরফ গলার ফলে ভয়াবহ আবহাওয়াগত বিপর্যয় মানবসমাজকে নতুন তুষারযুগের দিকে ঠেলে দেয়। কিন্তু এই ছবিগুলিতে জলবায়ু সংকটের জন্য মানুষের সম্মিলিত দায় কতটা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।

গানের জগতেও উদাহরণ খুব বেশি নেই। স্ম্যাশ মাউথের ১৯৯৯ সালের জনপ্রিয় গান ‘অল স্টার’-এ পৃথিবীর উত্তাপ বাড়ার ইঙ্গিতের পাশাপাশি প্রশ্ন তোলা হয়েছিল—‘আমার পৃথিবী জ্বলছে, তোমারটার কী অবস্থা?’ জলবায়ু সংকটকে শিল্পের বিষয় করে তোলা কঠিন, বিষণ্ণতাময়ও বটে। কিন্তু নিজেদের দায় ও অপরাধবোধকে আমরা এতটাই স্বাভাবিক করে নিয়েছি যে, সেগুলির মুখোমুখি হতেও যেন অস্বস্তি হয়।

নিজেদের কৃতকর্মের কথা ভেবে দর্শক অস্বস্তিতে পড়লেও ‘ডিগার’ চোখ ফিরিয়ে নেওয়ার সুযোগ দেয় না। ইনারিতুর কথায়, ‘এই ছবি একটি বিপর্যয়ের চলচ্চিত্র। কিন্তু বিপর্যয়টা আমরাই।’

তবে ছবিটির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা তার নৈরাশ্যবাদ। সংকট মোকাবিলায় মানুষের উদ্যোগ ও সম্ভাবনাকে সে প্রায় উপেক্ষা করে। ডিগার পরিচ্ছন্ন জ্বালানিকে অকেজো বলে উড়িয়ে দেয়। তার সৎবোন এমা—যে চরিত্রে সান্দ্রা হ্যুলারের প্রতিভার যথাযথ ব্যবহার হয়নি—নবীকরণযোগ্য শক্তি নিয়ে কিছু উদ্যোগ নিলেও সেগুলিকে তাচ্ছিল্য করা হয়। অথচ বাস্তবে নবীকরণযোগ্য শক্তির ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি ও জ্ঞানের অনেকটাই আমাদের হাতে রয়েছে। সবচেয়ে বড় অভাব রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং সম্মিলিত পদক্ষেপের।

‘ডিগার’ অবশ্য জলবায়ু সংকট নিয়ে তৈরি শেষ ছবি নয়। এ বছরের শেষের দিকে মুক্তি পাওয়ার কথা ‘এ স্টেটমেন্ট’-এর, যেখানে ১৯৮০ সালে বিশ্ব উষ্ণায়ন মোকাবিলার উপায় নিয়ে বিশেষজ্ঞদের একটি বাস্তব বৈঠককে নাট্যরূপ দেওয়া হয়েছে। ছবিতে অভিনয় করেছেন পল রাড ও পল জিয়ামাত্তি।

কিন্তু ‘ডিগার’-এর বাণিজ্যিক ব্যর্থতা ভবিষ্যতের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠতে পারে। প্যারামাউন্ট স্কাইড্যান্স ও এলিসন পরিবারের ওয়ার্নার ব্রাদার্স অধিগ্রহণের আগে প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পাওয়া সংস্থাটির শেষ ছবি ছিল এটি। বক্স অফিসের ব্যর্থতার সঙ্গে চলচ্চিত্র স্টুডিয়োগুলির মালিকদের মতাদর্শগত ঝোঁক মিলিয়ে জলবায়ু সংকটের নির্মোহ, রাখঢাকহীন কাহিনি বলার উদ্যোগ ভবিষ্যতে আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

অথচ এই ধরনের গল্পই এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। ‘ডিগার’ নিখুঁত চলচ্চিত্র নয়; তার ব্যঙ্গ অনেক সময় স্থূল, বক্তব্য অতিরঞ্জিত, আর ভবিষ্যৎ সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গি হতাশাজনক। তবু জলবায়ু সংকটের দায় থেকে আমাদের পালানোর পথ বন্ধ করে দেওয়ার ক্ষমতা তার রয়েছে। ছবিটির ব্যর্থতা তাই শুধু একটি চলচ্চিত্রের ব্যর্থতা নয়, আমাদের সময়েরও এক ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি। আর সেই ভুলের মাশুল হতে পারে আক্ষরিক অর্থেই হিমশৈলপ্রমাণ।